
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: বিএম আলামিন
সুন্দরবনে বনদস্যুদের অপতৎপরতা, জেলে-বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং নির্যাতনের প্রতিবাদে খুলনার কয়রায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করা, বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দস্যুদের স্থানীয় সহযোগীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করেন উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেল ৩টায় সুন্দরবনের সাকবাড়িয়া নদীর তীরে কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের সামনে উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের উদ্যোগে এবং কয়রা উপজেলা কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সহযোগিতায় এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন সুন্দরবন ও উপকূল সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম। বক্তব্য দেন সংগঠনের উপদেষ্টা আ ব ম আব্দুল মালেক, নাগরিক সংগঠন সুজনের কয়রা উপজেলা সভাপতি মোস্তফা শফিকুল ইসলাম, উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমান, সাবেক সেনা কর্মকর্তা এম আনোয়ার হোসেন, কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি সহকারী অধ্যাপক বিদেশ রঞ্জন মৃধা, কয়রা কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুল ইসলাম, বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো কয়রা উপজেলা শাখার সহসভাপতি জিএম মোনায়েম, কয়রা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন ও বনজীবী মুছানুর রহমানসহ অনেকে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গত দুই বছর ধরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বনদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। দস্যু বাহিনীগুলো সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ এবং মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। বনদস্যুদের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু মাছ ব্যবসায়ীও এসব অপতৎপরতায় সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, বনদস্যুদের স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে দুই ও পাঁচ টাকার নোটের নম্বরকে টোকেন হিসেবে ব্যবহার করে বনজীবীদের সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হচ্ছে। এ জন্য জেলেদের আগাম চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়। নির্ধারিত টোকেন ছাড়া বনে প্রবেশ করলে বনদস্যুদের হাতে জিম্মি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে জিম্মি হওয়া প্রত্যেক জেলেকে ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দিতে হচ্ছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
বক্তারা বলেন, সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। অথচ বনদস্যুদের ভয়ে এখন অনেক বনজীবী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিকে জীবিকার তাগিদ, অন্যদিকে অপহরণ ও মুক্তিপণের আতঙ্ক—এ দুইয়ের মধ্যে পড়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। এর ফলে শুধু বনজীবীরাই নন, তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও নিরাপত্তাহীনতা ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছেন।
মানববন্ধনে আয়োজক সংগঠনের সভাপতি সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা আজ বনদস্যুদের কারণে হুমকির মুখে। শুধু বনদস্যুদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; তাঁদের স্থানীয় সহযোগী, অর্থদাতা ও রসদ সরবরাহকারীদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধি এবং সুন্দরবনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান জোরদার করতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করা কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের একক দাবি নয়; এটি সমগ্র উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। বনদস্যুদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা, তাদের ব্যবহৃত অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার, অর্থ ও রসদ সরবরাহকারীদের শনাক্ত এবং দস্যুদের সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁরা প্রশাসন, বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সুন্দরবনে বনজীবীদের নিরাপদে প্রবেশ ও জীবিকা নির্বাহের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দল-মতনির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
মানববন্ধনে সুন্দরবননির্ভর জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।