
ইসলামের চুরি ও ছিনতাই একটি নিকৃষ্ট অপরাধ। ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবীর সব সমাজ ও ধর্মেই তা ঘৃণিত ও নিন্দিত একটি কাজ। আমরা চুরি বলতে বুঝি কারও অগোচরে তার সম্পদ নিয়ে যাওয়া। আর ছিনতাই মানে জোরজবরদস্তি করে বা শক্তি প্রয়োগ করে ও ভয় দেখিয়ে কারও সামনেই তার সম্পদ হরণ করা। শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে চুরির নির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও শর্ত রয়েছে। তা বর্ণনা করা আমার উদ্দেশ্য না। তবে পাপ-পুণ্যের বিচারে কারও সন্তুষ্টি ব্যতীত তার সম্পদ ব্যবহার করা চুরির মধ্যেই গণ্য।
দশের অধিক হাদিসে রাসুল (সা.) চুরির এই পরিচয়ই তুলে ধরেছেন।
কয়েকটি হাদিস লক্ষ্য করুন : ‘কোনো মুসলিমের পূর্ণ সন্তুষ্টি ব্যতীত তার সম্পদ ব্যবহার করা হালাল হবে না।’ [মুসনাদে আহমদ, খ. ৫, পৃ. ৭২]
তিনি আরও বলেন : ‘মুসলমানের মালের সম্মান তার রক্তের মতোই সম্মানিত।’ [কানযুল উম্মাল-৪০৪]
প্রকাশ থাকে যে, হাদিসে যদিও ‘মুসলমান’ ব্যবহার করা হয়েছে, তথাপি অপরাপর হাদিসের আলোকে মুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম বাসিন্দা যারা নিরাপত্তা নিয়ে বাস করে, কিংবা অমুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম বাসিন্দা যাদের অধীন মুসলমানরা নিরাপদে থাকে, তাদের জানমালের সম্মান ও সংরক্ষণও মুসলমানদের জানমালের মতোই জরুরি। তাই এই শব্দ দ্বারা যেন ভুল ধারণা সৃষ্টি না হয় যে, অমুসলিমদের জানমাল সম্মানযোগ্য নয়।
বিদায় হজের প্রাক্কালে রাসুল সা. মিনায় যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি বলেন- ‘কোনো ব্যক্তির জন্য তার ভাইয়ের কোনো মাল হালাল নয়, তা ব্যতীত, যা সে খুশি মনে দিয়েছে।’ [কানযুল উম্মাল-৩৯৭]
আবু হুমাইদ সায়েদি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন : ‘কোনো মুসলমানের জন্য হালাল নয় যে, সে নিজের ভাইয়ের কোনো মাল অন্যায়ভাবে নেবে। কেন না, আল্লাহ তায়ালা মুসলমানের মাল মুসলমানের ওপর হারাম করেছেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, এটাও হারাম করেছেন যে, কোনো ব্যক্তি নিজের ভাইয়ের লাঠিও তার সন্তুষ্টি ব্যতিরেকে নিয়ে না আসে।’ [মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ২/১৩১]
এসব হাদিসে একথাও স্পষ্ট হয়েছে যে, অপরের কোনো জিনিস নেওয়া কিংবা ব্যবহার করার জন্য তার সন্তুষ্টচিত্তে অনুমতি দেওয়া জরুরি। সুতরাং, কোনো চাপ কিংবা লজ্জার কারণে কেউ নিজের সম্পদ ব্যবহারের অনুমতি দেয়, অথচ মন থেকে রাজি নয়, তাহলে এমন অনুমতিকে প্রকৃত অনুমতি বলে ধরা হবে না। তাই তা অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য ব্যবহার করাও জায়েজ হবে না।
রাসুল (সা.) এর বাণীগুলো সামনে রেখে আমরা নিজেদের অবস্থা যাচাই করি। তাহলে দেখতে পাব, না জানি কত শাখায় আমরা জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে এসব বিধানের বিপরীত কাজ করছি। আমরা চুরি ও ছিনতাই ব্যস এটাই মনে করি যে, কোনো ব্যক্তি কারও ঘরে আত্মগোপন করে প্রবেশ করল এবং তার সামান চুরি করে নিয়ে গেল; অথবা শক্তি খাটিয়ে মাল ছিনতাই করল। অথচ কারও সন্তুষ্টি ছাড়া তার মালিকানাধীন কোনো জিনিস ব্যবহার করা — যে-কোনোভাবেই হোক — তা চুরি অথবা ছিনতাইয়ের গোনাহের শামিল হবে। এ প্রকারের চুরি বা ছিনতাইয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি আমাদের সমাজে ব্যাপক হয়ে গেছে; এবং ভালো শিক্ষিতজন ও ভদ্র ব্যক্তিরাও তাতে লিপ্ত।
ইসলাম চুরি ও ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে পার্থিব শাস্তি প্রদানে স্বচ্ছ আইন এবং তা দ্রুত কার্যকর করার বিধান প্রণয়ন করেছে। ইসলামে কোনো অপরাধী, দুর্নীতিবাজ, এমনকি খুনির শাস্তি প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ক্ষমা করার বিধান রাখা হয়নি। কারণ এতে অপরাধীদের ভবিষ্যতে আরো বড় ধরণের অপকর্ম করার সুযোগে করে দেওয়া হয়। এজন্য মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমার মেয়ে ফাতেমা চুরি করলেও আমি তার হাত কেটে দিব।’ (বুখারি : ৩২৮৮)।
আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে আখেরাতের পাথেয় নিয়ে কবরে যাওয়ার তৌফিক দিন, আমিন।
প্রভাষক আসাদুজ্জামান ফারুকী
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, কলারোয়া, সাতক্ষীরা।