বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ : দুই বছরের মুনাফা হারালেন ৭৫ লাখ আমানতকারী
পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ : দুই বছরের মুনাফা হারালেন ৭৫ লাখ আমানতকারী

পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ : দুই বছরের মুনাফা হারালেন ৭৫ লাখ আমানতকারী

দুই বছরের মুনাফা হারালেন ৭৫ লাখ আমানতকারী

অনলাইন ডেস্ক:

দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের গত দুই বছরের অর্থাৎ ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অর্জিত সমস্ত মুনাফা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং রীতি ‘হেয়ারকাট’ অনুসরণের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে, যার ফলে গ্রাহকদের জমা রাখা আসল টাকার স্থিতিও কমে আসবে।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে, সেগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রাহকদের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা বা লাভ প্রদান করা হবে না। এ সময়ে যেসব মুনাফা ইতিমধ্যে গ্রাহকদের হিসেবে জমা হয়েছে, তা ফেরত নেওয়া হবে বা কেটে রাখা হবে।

ব্যাংক খাতের ভাষায় একে বলা হয় হেয়ারকাট। সাধারণত কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হলে বা একীভূত করার সময় দায় কমাতে আমানতের একটি অংশ বা মুনাফা কেটে রাখা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ পাঁচ ব্যাংক গত দুই বছরে বিশাল অংকের লোকসান গুনেছে। ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে ৭ থেকে ৯ শতাংশ হারে মুনাফার আমানত রয়েছে। এ দুই বছরের মুনাফা বাদ দেওয়ার ফলে ৭৫ লাখ আমানতকারীর আমানতের চূড়ান্ত স্থিতি আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ পাঁচটি ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানতের চেয়ে ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ঋণের একটি বড় অংশই ইতিমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে।

ব্যাংকগুলোর এ ভয়াবহ আর্থিক পরিস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল সাবেক বিএবি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চারটি ব্যাংক অর্থাৎ ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ছিল বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তারা দুজনেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এসব ব্যাংকে নামে ও বেনামে তাদের শেয়ার রয়েছে, ঋণের সুবিধাভোগীও তারা।

অভিযোগ রয়েছে, নামে বেনামে এ ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়ে শেষ পর্যন্ত একীভূত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে।

প্রশাসকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, রেজোল্যুশন স্কিমের সুষম বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এ কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের হিসাবের ওপর ভিত্তি করে গ্রাহকদের আমানত পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এ প্রক্রিয়াটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে আমানতকারীদের মুনাফা কর্তনের পাশাপাশি এ পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার মূল্যও শূন্য ঘোষণা করা হয়েছিল। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা পরিচালক সবাই তাদের বিনিয়োগ হারিয়েছেন। এখন মুনাফা হারানোর মাধ্যমে আমানতকারীরাও সেই লোকসানের অংশীদার হলেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ কঠোর পথ বেছে নিয়েছে।

তবে সাধারণ আমানতকারীরা, যারা কষ্টের উপার্জিত টাকা এ ব্যাংকগুলোতে রেখেছিলেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা। ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সফল হলে দীর্ঘমেয়াদে আমানতকারীদের মূল টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন নতুন ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি থেকে বিরত থাকুন,ধন্যবাদ।