আসিফ মাহমুদ ছিলেন ইউনূস সরকারের দুর্নীতির ‘পোস্টার বয়’। গত দেড় বছরে উপদেষ্টা হিসেবে তিনি ইতিবাচক কিছুর প্রমাণ করতে না পারলেও দুর্নীতির পোস্টার বয় হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। দেড় বছরে কোনো ভালো কাজের জন্য নয়, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বারবার তার নাম সামনে এসেছে। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, ছাত্রনেতা থেকে একজন বিতর্কিত দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে-
উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি-আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের আওতায় কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের পঁচিশ শতাংশ অর্থ উপদেষ্টাকে দিতে হতো। তা না হলে অর্থ ছাড় করা হতো না। উপদেষ্টার কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম এই কমিশন তদারকি করতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ওয়াশার এমডি নিয়োগে কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ-অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে ওয়াশার এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় আব্দুস সালামকে। তাকে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি ছিলেন একই সংস্থার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। এ পদে চাকরিকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। আবদুস সালামের কানাডায় বাড়ি আছে। অভিযোগ বলা হয়েছে, সালাম উপদেষ্টাকে ১০ কোটি টাকা দিয়ে এই পদ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ে আল আনসারি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। বাকি দুই কোটি টাকা নগদ পরিশোধ করা হয়েছে।
উত্তর সিটিতে প্রশাসক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য-২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের সঙ্গে লেনদেনের মাধ্যমে এই নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। নগদ বিশ কোটি টাকা এবং সিটি করপোরেশনের সকল কাজে নিয়মিত দশ শতাংশ কমিশনের শর্তে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছিল। ঘুষ দিয়ে নিয়োগ পেয়ে এজাজ বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। তার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে অপসারণ করা হয়। ডিএনসিসির অধীনস্থ মিরপুর গাবতলী পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, বোরাক টাওয়ার বা হোটেল শেরাটনের ভাগ, বনানী কাঁচাবাজারে দোকান বরাদ্দ, খিলগাঁও তালতলা সুপার মার্কেটের পার্কিং স্থানে দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দ, সিটি করপোরেশনের ভ্যান সার্ভিস, ফুটপাতে দোকান বরাদ্দ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য নানা বিষয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার কথা বলছে দুদক। এজাজের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, আসিফ মাহমুদের টাকা জোগাড় করতেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন এজাজ।
টেন্ডার বাণিজ্য-দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি হয়েছে। সব টেন্ডারেই দশ থেকে ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত উৎকোচ নিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। তার কথিত প্রেস সেক্রেটারি প্রতিটি টেন্ডারে হস্তক্ষেপ করেছেন। লেনদেন চূড়ান্ত হওয়ার পরই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি কল রেকর্ডও চিঠির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
পদায়ন বাণিজ্য-২০২৪ সালে আগস্ট থেকে বিদায়ের আগে পর্যন্ত জনপ্রশাসনের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন আসিফ মাহমুদ, এরকম লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে বেশ কয়েকটি। সারাদেশে ডিসি নিয়োগে আসিফ মাহমুদ ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। যার মধ্যে ৩৬ জনকেই জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ আছে, জেলা ভেদে জেলা প্রশাসক পদায়নে দুই থেকে দশ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন হয়েছে বলে লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। শুধু জেলা প্রশাসক নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের, প্রকল্পের দায়িত্ব পেতে, এমনকি সচিব পদে পদোন্নতির জন্যও আসিফ মাহমুদের কাছে তদবির করতেন সরকারি কর্মকর্তারা। মোটা অঙ্কের লেনদেন চূড়ান্ত হলেই আসিফ তদবির শুরু করতেন।
ক্রিপ্টোকারেন্সি বিতর্ক-আসিফ মাহমুদ ব্যাংক হিসাব সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশের পর সমালোচনার ঝড় ওঠে। সবাই বলতে শুরু করে, চুরির টাকা কেউ কী ব্যাংকে রাখে?
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদের বেশিরভাগ অর্থই ক্রিপ্টোকারেন্সি করে রাখা। এছাড়াও দুবাইয়ে আসিফ সম্পদ এবং বিনিয়োগ করেছেন বলে জানা গেছে। সুইস ব্যাংকে তার অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। আসিফ মাহমুদ উপদেষ্টা হওয়ার পর অন্তত তিনবার সুইজারল্যান্ড সফর করেছেন। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুসারে, ওই দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (সুইজারল্যান্ডের মুদ্রা)। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। এসব টাকা যে আসিফ মাহমুদ এবং ইউনূস সরকারের উপদেষ্টারা পাচার করেছেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।