Wednesday, 7th October 2026

সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ
কয়রায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট
কয়রায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট

কয়রায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট

​

​কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি:বিএম আলামিন
জলবায়ু পরিবর্তনের চরম আঘাত ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার তীব্র প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় সুপেয় পানির সংকট দিন দিন আশঙ্কাজনক রূপ নিচ্ছে। পানীয় জলের এই মানবিক সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সরাসরি অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) ও এর কার্যকর ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন দেশি-বিদেশি পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।

​বুধবার (৭ অক্টোবর) কয়রারর ঐতিহ্যবাহী খান সাহেব কোমর উদ্দিন কলেজ মিলনায়তনে “নিরাপদ পানি ও জলবায়ু সহনশীলতা” শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) উদ্যোগে এবং স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

​উক্ত মতবিনিময় সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এ্যাডামস ফাউন্ডেশন এবং ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধিসহ জলবায়ু ও পানিসম্পদ বিষয়ের শীর্ষস্থানীয় গবেষকরা অংশ নেন। প্রতিনিধি দলটি সম্মেলনের পূর্বে কয়লার প্রান্তিক এলাকাগুলো ঘুরে স্থানীয় পানির উৎস, লবণাক্ততার প্রকোপ ও প্রতিদিন পানি সংগ্রহে গ্রামীণ নারী ও শিশুদের সীমাহীন দুর্ভোগ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। একই সাথে তারা ভুক্তভোগী অধিবাসীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও মতামত শোনেন।

​অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইউনেস্কো চেয়ার ড. মোহাম্মদ নুরুন্নবী এবং বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মনজুরুল কিবরিয়া।

​বিশেষজ্ঞরা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট কেবল একটি সাধারণ মৌলিক চাহিদার সমস্যা নয়; এটি প্রত্যক্ষভাবে জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় জীবিকা এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের কায়িক শ্রমের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে পানি আনার কারণে প্রান্তিক নারীদের শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ক্ষণস্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং স্থানীয় ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এনে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি।

​তারা আরও উল্লেখ করেন, বর্ষা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে দূরবর্তী কৃত্রিম উৎস ও ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে। এজন্য প্রতিটি পরিবার বা কমিউনিটি পর্যায়ে মানসম্মত পানির ট্যাংক স্থাপন, ঐতিহ্যবাহী ও সরকারি জলাধারসমূহ পুনঃখনন, সংগৃহীত পানির নিয়মিত মান পরীক্ষা এবং অবকাঠামোগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। একই সাথে, এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে স্থানীয় জনগণকে দক্ষ করে তুলতে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রতিও গুরুত্বারোপ করা হয়।

​সভায় উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যদি পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা করা যায়, তবে শুষ্ক মৌসুমে মাইল কে মাইল হেঁটে পানি আনার মর্মান্তিক দুর্ভোগ থেকে তারা মুক্তি পাবেন।

​আয়োজক ও বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, মাঠপর্যায়ের এই পর্যবেক্ষণ এবং ভূখণ্ডের মানুষের নিজস্ব মতামতকে কাজে লাগিয়ে কয়রাসহ সম্পূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখীভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি থেকে বিরত থাকুন,ধন্যবাদ।