
নতুন সূর্য ডেস্ক:
টেকনাফ সীমান্তে ইয়াবা নির্মূলের আড়ালে ওসি প্রদীপের কথিত ক্রসফায়ারে নিরীহ মানুষ হত্যা, ইয়াবা ও চোরাকারবার বাণিজ্য, সুন্দরী নারীদের ধর্ষণ এবং ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করার ডকুমেন্টারি তথ্য মেজর সিনহার হাতে পৌঁছে যাওয়ায় মেজর সিনহাকে হত্যার পরিকল্পনা নেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। সে কারণে প্রথমে মেজর সিনহাকে ডাকাত সাজিয়ে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল প্রদীপ-লিয়াকতরা। তাতে সফল না হয়ে সরাসরি গুলি করে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তাদের ভাবনায় ছিল অন্য দশটি ক্রসফায়ারের মতো এই হত্যাকাণ্ডটিও মিথ্যা গল্প সাজিয়ে সামাল দিতে পারবেন কিন্তু হয়নি।
সিনহা হত্যা মামলায় মেজর সিনহার সহকর্মী প্রত্যক্ষদর্শী সাহেদুল ইসলাম সিফাতের আদালতে দেয়া বক্তব্যে এই তথ্য উঠে এসেছে। এ ছাড়া সোমবার ঘোষিত রায়েও হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচারক কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল রায় পড়ার সময় উল্লেখ করেন, ‘ঘটনাস্থলে দায়িত্বপ্রাপ্ত যারা ছিলেন তারা সিনহাকে পরিচয় জেনে স্যালুট জানিয়ে চলে যেতে বললেন কিন্তু তাদের আবার আটক করার প্রয়োজন হলো কেন বা গুলি করার প্রয়োজন হলো কেন? এটা কি কোনো পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল? এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে রহস্যটা কী আমি চেষ্টা করেছি সেটা বের করতে। আপনারা লক্ষ করেছেন দুই পক্ষকে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করেছি কেন এই রকম ঘটনা ঘটল? বিশেষ করে ৩৪২ ধারায় এসআই শাহজাহানকে জিজ্ঞেস করেছি এবং প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরাও বলছেন। দায়িত্বরতদের উদ্দেশে বলেছি, ‘এই হত্যাকাণ্ডটা প্রতিরোধ করতে পারলেন না কেন? দায়িত্ব ছিল চেকপোস্টে আটকে রাখা। যদি তাই হতো এই দুঃখজনক ঘটনাও ঘটত না এবং এই বিচারেরও প্রয়োজন হতো না। চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা এসআই শাহজাহান খুব চমৎকারভাবে উত্তর দিয়ে বলেছেন, লিয়াকত আলী পাশে একটা বটগাছের নিচে দাঁড়ানো ছিল এবং ওনি হঠাৎ ১০ থেকে ২০ সেকেন্ডের মধ্যে গুলিটা করে ফেলেছেন। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটছে। এতে পরিষ্কার এই হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত।’
ঘোষিত রায়ে আরো উল্লেখ করা হয় যে, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত কারণে স্বেচ্ছাবসরে গিয়ে দেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক, ভ্রমণ ও পর্যটন বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে ডকুমেন্টারি ভিডিওচিত্র তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য তিনি ‘জাস্ট গো’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল প্রতিষ্ঠার কাজ করছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও আরো দুইজন সহকর্মী নিয়ে ২০২০ সালের ৩ জুলাই কক্সবাজার আসেন। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে সাগর ও পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্যে তিনি বিমোহিত হয়ে পড়েন। ধারণ করতে থাকেন নানা চিত্র। বেশ কিছু দিন তিনি কখনো পাহাড়ের চূড়ায় অথবা সমুদ্রসৈকতের দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সাথেও তার সখ্য গড়ে ওঠে। কাজের ফাঁকে তিনি স্থানীয়দের দুঃখ-সুখের গল্প শোনেন। এসময় উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় ইয়াবা দমনের নামে ওসি প্রদীপের হত্যাযজ্ঞ চলছিল। স্থানীয় জনগণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মেজর সিনহা এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে ওসি প্রদীপের ইয়াবা দমনের আড়ালে ইয়াবা বাণিজ্য, চোরাচালান ও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায়ের তথ্যপ্রমাণ পেয়ে যান। এতেই সংক্ষুব্ধ হয়ে রক্তনেশায় উন্মত্ত প্রদীপ মেজর সিনহাকে ক্রসফায়ারে শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কারাগারে কয়েদির পোশাকে নির্বাক প্রদীপ-লিয়াকত : কক্সবাজার জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ৫৬০ জনের। এখানে হাজতি-কয়েদি মিলিয়ে আছেন সাড়ে চার হাজারের মতো বন্দী। এ কারাগারেই দু’টি কক্ষকে কনডেমড সেল ঘোষণা করে রাখা হয়েছে আলোচিত সিনহা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীকে। এ ছাড়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের বিশেষ পৃথক কক্ষে রাখা হয়েছে। তাদের গায়ে পরিয়ে দেয়া হয়েছে কয়েদির পোশাক। রায় ঘোষণার সময় প্রদীপ ও লিয়াকত যেমন ছিলেন নির্বিকার ঠিক তেমনি আদালত থেকে কারাগারে ফেরার পথেও তারা কোনো কথা বা প্রতিক্রিয়া জানাননি। কারাগারেও তারা একেবারে চুপচাপ রয়েছেন। কারো সাথে কথা বলছেন না। তবে খাবার দাবার অনেকটাই স্বাভাবিক আছে বলে কারা সূত্র জানিয়েছে। কারাগারের অন্য বন্দীদের মতো তাদের খেতে দেয়া হয় সাদা ভাত, মাছ ও সবজি।
সোমবার বিকেল ৫টার দিকে আদালত থেকে জেলা কারাগারে নেয়ার জন্য আসামিদের যখন প্রিজনভ্যানে ওঠানো হচ্ছিল, তখন কয়েকজন আসামি চিৎকার করলেও প্রদীপ ও লিয়াকত ছিলেন নির্বিকার। কক্সবাজার জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক (জেল সুপার) মো: নেসার আলম জানান, প্রদীপ লিয়াকতের জন্য দুইটি কক্ষকে কনডেমড সেল করে সেখানে তাদের রাখা হয়েছে। তাদের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক আছে। রাতের খাবার ও সকালের নাশতাও খেয়েছেন দু’জন। বাইরের কারো সাথে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। হাইকোর্টের রেফারেন্স পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তাদের কক্সবাজার কারাগারেই রাখা হবে। তবে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের অন্য কারাগারেও পাঠানো হতে পারে বলে জানান তিনি।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম জানান, প্রদীপ কুমার দাশের নির্দেশে এবং লিয়াকত আলীর গুলিতে সিনহার হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। আদালতের রায়ে পরিকল্পিত হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি বিভিন্ন তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো জানান, প্রদীপ কুমার দাশ টেকনাফ মডেল থানায় ২২ মাস ছিলেন। ওই সময়ে টেকনাফে ১৪৪টির বেশি কথিত মাদকবিরোধী অভিযান ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় অন্তত ২০৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বেশ কিছু নিরীহ লোককে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। মাদক মামলার আসামি করে শত শত নারী-পুরুষকে কারাগারে পাঠিয়েছেন তিনি। কারাগারের সাড়ে চার হাজার বন্দীর মধ্যে ৮০ শতাংশ মাদক মামলার আসামি।