বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ
সেনাবাহিনীকে নয়, দায়ী করুন অপরাধীকে
সেনাবাহিনীকে নয়, দায়ী করুন অপরাধীকে

সেনাবাহিনীকে নয়, দায়ী করুন অপরাধীকে

বাংলাদেশ ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম স্থানে ছিল। তার আগেও কখনো প্রথম, কখনো দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের বহু গৌরবময় অধ্যায়ের অংশ বাংলাদশের শান্তিরক্ষীরা,  যা একদিকে জাতির জন্য গর্ব, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা, মানবিক সংবেদনশীলতা ও নৈতিক নিরপেক্ষ ভূমিকা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে বিশেষভাবে প্রশংসিত। কিন্তু এই গৌরব অর্জনের পথ একেবারে সহজ ছিল না। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু আজ পর্যন্ত অনেক বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত  ১৬৮ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ দিয়েছেন। তাঁরা রক্ত দিয়ে লিখেছেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদার ইতিহাস। এই আত্মত্যাগ শুধু সংখ্যায় পরিমাপযোগ্য নয়। শান্তিরক্ষীরা বিদেশে কর্মরত থেকে পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে এ পর্যন্ত প্রায় তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছেন, যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব একাধিকবার বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন—বিশেষত নারী শান্তিরক্ষীদের ভূমিকার জন্য। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ নারী শান্তিরক্ষায় বৈশ্বিক নেতৃত্বের উদাহরণ। ’

এক কথায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ যে মর্যাদা ও বিশ্বাসের অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তার মূল কারণ তাদের অভ্যন্তরীণ নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা। অপরাধ ও দুর্নীতিকে ‘না’ বলা শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি সেনাবাহিনীর আত্মপরিচয়ের অংশ। এই চেতনাই এ বাহিনীকে অনন্য করে তুলেছে দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পরিসরেও। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও ভাবমূর্তির আন্তর্জাতিক প্রতিফলন। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, প্রযুক্তি, তথ্যযুদ্ধ, প্রতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও তথ্য-নিরপেক্ষতার ভারসাম্য বজায় রেখে সামরিক শক্তি ও নৈতিক শক্তির মধ্যকার সঠিক সমন্বয় সাধন করেছে।

কোনো পেশাদার বাহিনীর ভেতরে যদি কিছু সদস্য লোভ, ক্ষমতা বা প্রভাবের প্রলোভনে নীতিভ্রষ্ট হয়, তবে তা শুধু একটি ব্যক্তির নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত করে। গণমাধ্যম বা সামাজিক প্ল্যাটফর্মে একটি অপরাধের খবর, সেটি যত ক্ষুদ্রই হোক, বহুগুণে ছড়িয়ে পড়ে। তখন সাধারণ মানুষ বাহিনীর নৈতিকতার ওপর প্রশ্ন তোলে, যদিও এই বাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য সৎ ও নিষ্ঠাবান। তবে এর দায় শুধু বাহিনীর নয়, নাগরিকসমাজ, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল অংশকেও সমানভাবে সচেতন হতে হবে। গুজব ও প্রোপাগান্ডার যুগে তথ্য যাচাই না করে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মন্তব্য করা শুধু একটি বাহিনী নয়, পুরো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকেই দুর্বল করে।

বাংলাদেশে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের শাসনামলে এবং সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে উচ্চপদস্থ কিছু সেনা কর্মকর্তার নামে যে ‘আয়নাঘর, গুম, খুন বা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট’ ইত্যাদি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে প্রায়ই সেনাবাহিনীকে সরাসরি যুক্ত করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তবে বাস্তবতা হলো, এ ধরনের কার্যক্রমে যারা জড়িত, তারা মূলত ব্যক্তিগত লোভ, লালসা বা সরকারের চাপে বাধ্য হয়ে এমন কাজ করেছে। এটি কোনোভাবেই পুরো সেনাবাহিনী বা তার নীতি ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

সেনাবাহিনী দেশের আইন ও সংবিধানের প্রতি অঙ্গীভূত এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে অনিয়ম বা অপরাধমূলক কার্যক্রমে যুক্ত হয় না। তাই এ ধরনের ঘটনাকে পুরো সেনাবাহিনীর নামে প্রচার করা তথ্যবহুল নয় এবং বিভ্রান্তিকর। বাস্তবধর্মী মূল্যায়ন নির্দেশ করে যে এ ধরনের অপরাধ মূলত ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও নৈতিক পতনের ফল, যা রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কঠোর শৃঙ্খলা, সংবিধানসম্মত কার্যক্রম এবং দেশপ্রেমের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বা সাবেক কিছু কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পুরো সেনাবাহিনীর সঙ্গে মেলানো ভিত্তিহীন এবং প্রকৃত সত্যের বিপরীত।পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু একটি সামরিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি জাতির নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রতীক। ‘সেনাবাহিনীকে নয়; বরং অপরাধীকে দায়ী করুন’ নীতি এই প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি। এটি শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি সেনাবাহিনীর নৈতিক চেতনা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের প্রতিফলন। প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে এই নীতি বাস্তবায়নই বাহিনীর শক্তি, জনগণের আস্থা ও দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করে

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি থেকে বিরত থাকুন,ধন্যবাদ।