ডেস্ক নিউজ:
কেউ ক্রিকেটের মাঠে খেলোয়াড়, কেউ আম্পায়ার, কেউবা সংগঠক—কিন্তু একজন মানুষ যদি দীর্ঘ চার দশক ধরে ক্রীড়া, সংগঠন, সমাজসেবা ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন, তাহলে তাঁর পথচলা হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার গল্প। মীর তাজুল ইসলাম রিপন তেমনই এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে ক্রীড়াঙ্গন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে।
প্রায় চার দশকের কর্মময় জীবনে তিনি কখনো ক্রিকেটারের ভূমিকায়, কখনো আম্পায়ার হিসেবে, আবার কখনো ক্রীড়া সংগঠক ও সমাজসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর দীর্ঘ এই পথচলায় রয়েছে সাফল্য, দায়িত্ববোধ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নিরলস প্রচেষ্টা।
ক্রিকেট দিয়ে শুরু পথচলা
মীর তাজুল ইসলাম রিপনের ক্রীড়া জীবনের সূচনা ১৯৮৯ সালে স্কুল ক্রিকেটের মাধ্যমে। কৈশোরেই ক্রিকেটের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে নিয়ে যায় প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের বৃহত্তর পরিসরে।
১৯৯৪ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটে অংশ নেন। এরপর ১৯৯৬ সালে খেলেন সাতক্ষীরার প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগে। তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি আসে আরও বড় পরিসরে। ১৯৯৭ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ জেলা দলের হয়ে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি।
পরবর্তীতে ঢাকার বিকেএসপির প্রথম ব্যাচের খেলোয়াড়দের সঙ্গেও খেলার সুযোগ পান। ১৯৯৮ সালে ঢাকা দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটে অংশ নিয়ে নিজের ক্রীড়া প্রতিভার আরও পরিচয় দেন।
একজন খেলোয়াড় হিসেবে মাঠের অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু ক্রিকেটার হিসেবেই সমৃদ্ধ করেনি; পরবর্তী সময়ে ক্রীড়া সংগঠক ও আম্পায়ার হিসেবেও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
খেলোয়াড় থেকে আম্পায়ার
খেলোয়াড়ি জীবনের পাশাপাশি ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন মীর তাজুল ইসলাম রিপন।
দীর্ঘ সময় ধরে আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ক্রিকেটের মাঠে তাঁর অভিজ্ঞতা ও সম্পৃক্ততা আরও বিস্তৃত হয়। খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে থাকার পর একজন আম্পায়ার হিসেবে খেলার নিয়ম-কানুন, শৃঙ্খলা ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন তিনি।
ক্রীড়াঙ্গনের পাশাপাশি ১৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী টাউন স্পোর্টিং ক্লাবের জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এই দায়িত্ব তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
ক্রীড়া সংগঠনে দীর্ঘ দায়িত্ব
মীর তাজুল ইসলাম রিপনের কর্মময় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে ঘিরে। ২০১২ ও ২০১৬ সালে তিনি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি সফলতার সঙ্গে জয়েন্ট সেক্রেটারি ও ক্রিকেট সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি সাতক্ষীরার ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।ক্রীড়ার প্রতি ভালোবাসা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার কারণে সহকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের কাছেও তিনি আস্থার জায়গা তৈরি করেছেন।
স্বীকৃতিতে সমৃদ্ধ কর্মময় জীবন
দীর্ঘ কর্মজীবনে ক্রীড়া ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন মীর তাজুল ইসলাম রিপন।
২০২৪ সালে ভারতে তিনি অর্জন করেন ‘মহাত্মা গান্ধী শান্তি পদক’। ক্রীড়া সংগঠন, সমাজসেবা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া এই সম্মান তাঁর দীর্ঘ পথচলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন।
এছাড়া জাতীয় পর্যায়েও দুইবার পদক অর্জন করেছেন তিনি। এসব স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয়
মীর তাজুল ইসলাম রিপনের পরিচয় কেবল একজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্রীড়ার পাশাপাশি সমাজসেবা ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয়। মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক কিছু করার প্রত্যয় তাঁর দীর্ঘ পথচলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ক্রীড়া সংগঠন থেকে সমাজসেবা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে তৈরি করেছে একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। নিজের অর্জনকে ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করাই যেন তাঁর পথচলার বড় শিক্ষা।
চার দশকের পথচলা, নতুনদের জন্য অনুপ্রেরণা
প্রায় চার দশকের এই দীর্ঘ পথচলায় মীর তাজুল ইসলাম রিপনের জীবনে এসেছে নানা দায়িত্ব, সাফল্য ও স্বীকৃতি। স্কুল ক্রিকেটের ছোট্ট পরিসর থেকে শুরু করে বিভাগীয় পর্যায়ে সাফল্য, ঢাকা দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট, বিসিবির আম্পায়ারিং, ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের দায়িত্ব এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদ—প্রতিটি অধ্যায় তাঁর কর্মময় জীবনের আলাদা পরিচয় বহন করে।
ক্রীড়া, সংগঠন, সমাজসেবা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয়তা প্রমাণ করে—একজন মানুষ চাইলে নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ সময় সমাজের জন্য কাজ করে যেতে পারেন।
মীর তাজুল ইসলাম রিপনের চার দশকের এই পথচলা তাই শুধু একজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের জীবনের গল্প নয়; এটি পরিশ্রম, নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের পাশে থাকার এক অনুকরণীয় অধ্যায়। তাঁর এই কর্মময় জীবন আগামী প্রজন্মকে ক্রীড়া ও সমাজসেবায় এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা জোগাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
