বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ
খালেদা জিয়ার সংগ্রামী জীবন
খালেদা জিয়ার সংগ্রামী জীবন

খালেদা জিয়ার সংগ্রামী জীবন

অনলাইন ডেস্ক:

একজন গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এমনকি আপোসহীন, গণতন্ত্রের প্রতীক, মাদার অব ডেমোক্রেসি, দেশনেত্রীসহ নানা বিশেষণেও ভূষিত করা হয় তাকে। কিন্তু এ সবগুলো অর্জনের পেছনে তাকে পুরো জীবন ধরেই সংগ্রাম করতে হয়েছে।
মূলত খালেদা জিয়ার সংগ্রাম শুরু হয়েছে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় থেকেই। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা পাঠ করার পর থেকেই খালেদা জিয়ার সংগ্রাম শুরু। জিয়াউর রহমান তার পরিবারের কথা চিন্তা না করেই দেশের জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

আর খালেদা জিয়াও আত্মসমর্পণ কিংবা পাকিস্তানিদের অনুগ্রহ কিংবা দয়ার জন্য তাদের দ্বারে দ্বারে ঘোরেননি।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর খালেদা জিয়া প্রথমে চট্টগ্রামে পালিয়ে থাকেন তার এক আত্মীয়ের বাসায়। প্রায় দুই মাস নিজেকে এবং দুই ছেলে-তারেক রহমান, আরাফাত রহমান কোকোকে- অবরুদ্ধ করে রাখেন। তবে চট্টগ্রাম ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠলে সেখান থেকে দুই ছেলেকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে ১৯৭১ সালের ১৬ মে তার বোন খুরশিদ জাহান হকের বাসায় যান। কালো বোরকায় নিজেকে ঢেকে চট্টগ্রামের লঞ্চঘাটে যেতে হয়েছিল তাকে। গাড়িতে লঞ্চঘাট যাওয়ার সময় নিয়মিত সড়ক ব্যবহার না করে তাকে বেছে নিতে হয়েছিল বিকল্প অপ্রচলিত পথ। কারণ পাকিস্তানি সেনারা তখন মোড়ে মোড়ে ভারি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাহারা বসিয়েছিল। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে লে. মাহফুজের স্ত্রীসহ চট্টগ্রাম লঞ্চ টার্মিনাল থেকে লঞ্চে ওঠেন তিনি। ছোট ছোট দুই ছেলেকে নিয়ে এমন বিপদসংকুল পথ পাড়ি দেওয়া ছিল দুঃসাধ্য।

বোন খুরশিদ জাহান হক এবং তার স্বামী মোজাম্মেল হককে সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে করে খালেদা জিয়া ও তার দুই সন্তানকে ঢাকার খিলগাঁওয়ে নিয়ে আসা হয়। তবে, অল্প সময়েই পাকিস্তানি সেনারা খালেদা জিয়ার বিষয়ে তথ্য ফাঁস হওয়ায় মোজাম্মেল হক ২৮ মে খালেদা জিয়াকে নিয়ে যান ধানমন্ডিতে তার এক চাচার বাসায়। তবে, সেখানেও নিরাপদ বোধ না করায় খালেদা জিয়া তার দুই ছেলেকে নিয়ে সিদ্ধেশরীর এক বাসায় লুকিয়ে থাকেন। এ সময়ে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন মোজাম্মেল হক। তবে, অনেক নিপীড়নেও তিনি স্বীকার করেননি খালেদা জিয়া কোথায় আছেন। অবশেষে ২ জুলাই গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া। গ্রেপ্তারের পর খালেদা জিয়া ও দুই সস্তানকে প্রথমে পুরানো সংসদ ভবন এবং পরে ঢাকা সেনানিবাসের একটি বাড়িতে রাখা হয়। ওই বাড়িতে তিনি ছিলেন দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত।

বন্দি অবস্থায় খালেদা জিয়া ছিলেন স্থির এবং চুপচাপ। এ সময়ে তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিয়াউর রহমানকে আত্মসমর্পণের হুমকি দেওয়া হয়। এতেও বিচলিত হননি খালেদা জিয়া। জিয়াউর রহমান পাল্টা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ধমক দিয়ে চিঠি লেখেন।

নানা পট পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে হত্যাকা-ের শিকার হন। জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার সময় কোনো সম্পদ কিংবা কোনো অর্থ রেখে যাননি পরিবারের জন্য। নানা অর্থকষ্টে সংসার চালাতে হয়েছে বেগম জিয়াকে।
এর পর ১৯৮৩ সাল থেকে তার রাজনীতিতে সংগ্রামের নয়া সূচনা শুরু হয়। তিনি ৮৩ সালেই বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় নেতৃত্বে আসেন। রাজপথের আন্দোলন, বিবৃতি, গ্রেপ্তার সব মিলিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতির দৃশ্যমান মুখে পরিণত হন। ৮৩ সাল থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত বেগম জিয়াকে সাতবার গ্রেপ্তার করে স্বৈরাচার এরশাদ। তবু তাকে কোনোভাবেই টলাতে পারেনি তার সংগ্রাম থেকে।

১৯৮৬ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে সেই নির্বাচন বর্জন তখনকার পটভূমিতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়। আওয়ামী লীগ, জামায়াত সে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কোনভাবেই খালেদা জিয়ার রাজপথের সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার আপসহীন ভূমিকার ফলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁকে পরিণত করে একজন আপসহীন নেতা হিসেবে।

২০০৬ সালে তিনি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে, তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্বাসনে পাঠানোর একাধিক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুর্নীতির তুচ্ছ এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে স্বৈরাচারী সরকার গ্রেপ্তার করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় তখনকার শক্তিগুলোর কাছ থেকে আপোস করে ক্ষমতা নেওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন বেগম জিয়া।

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। প্রায় এক বছর আট দিন জেলে থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করে পাঁচ বছরের সাজা দিয়ে রায় দেন ঢাকার জজ মো. আখতারুজ্জামান। রায়ের পর ওই দিনই নাজিমউদ্দিন সড়কের ওই কারাগারে নেওয়া হয় ৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়াকে। ৭৭৫ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে তাকে।

২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট পর্যন্ত পুরো সময়টাতে বেগম খালেদা জিয়া একদিকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই সংগ্রাম করেছেন অন্যদিকে কোর্টের বারান্দায় তাকে দৌড়াতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। বরণ করতে হয়েছে কারাগার।
এর মধ্যে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মালয়েশিয়ায় মারা যান। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের মে মাসে আটক অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল তাকে। তার পর থেকে তিনি বিদেশেই অবস্থান করছিলেন।

দীর্ঘ ৫৪ বছর এক টানা শোক এবং সংগ্রামের ইতিহাস খালেদা জিয়ার জীবনেই ঘটেছে। এমনকি গত বছরের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরও তাকে দেশকে নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে হয়েছে। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার এমন নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়া আজীবন সংগ্রামী একজন মানুষ। তিনি নিজ পরিবারের উপরে দেশকে এবং দেশের মানুষকে স্থান দিয়েছেন। এমনকি তিনি দেশের মানুষকে ভালোবেসে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। তিনি আজীবন তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকেই দেশের জন্য লড়ে গেছেন। কখনো হতাশা কিংবা আপোস করেননি। পৃথিবীর সংগ্রামী নারী, সংগ্রামী মানুষ এবং সংগ্রামী রাজনীতিবিদের জায়গায় তিনি নিজের স্থান তৈরি করে গেছেন।

সৌজন্যে: জনকন্ঠ

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি থেকে বিরত থাকুন,ধন্যবাদ।