গীবত:
সমাজ ধ্বংসকারী একটি নীরব ব্যাধি….

লেখক পরিচিতি:
হাফেজ মাওলানা ক্বারী শাহরিয়ার হুসাইন আজহারী
আল আজহার ইউনিভার্সিটি, মিশর
মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামতগুলোর একটি হলো জিহ্বা। এই জিহ্বার সঠিক ব্যবহার মানুষকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, আর এর অপব্যবহার তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে পারে। ইসলামে যেসব কাজ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো গীবত। কারণ, গীবত শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; এটি একটি সামাজিক ব্যাধি, যা ধীরে ধীরে সমাজের ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও শান্তিকে ধ্বংস করে দেয়।
🟢 গীবতের সংজ্ঞা
গীবত হলো— কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ আলোচনা করা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে, যদিও তা সত্য হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের উদ্দেশ্যে গীবতের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন—এটাই গীবত।
🟢 কুরআনের আলোকে গীবত
পবিত্র কুরআনের এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করো। (সূরা হুজুরাত: 12)
এই আয়াত গীবতের ভয়াবহতা এমনভাবে তুলে ধরেছে, যা বিবেকবান মানুষকে কাঁপিয়ে দেয়।
পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ
ধ্বংস তাদের জন্য, যারা পরনিন্দা করে এবং দোষ খুঁজে বেড়ায়। (সূরা হুমাযাহ: 1)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা গীবতকারী ও অপমানকারীদের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন।
🟢 হাদিসের আলোকে গীবত
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟» قَالُوا: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: «ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ»
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কি জানো গীবত কী?” সাহাবারা বললেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তিনি বললেন, “তোমার ভাই সম্পর্কে তোমার এমন কথা বলা, যা সে (শুনলে) অপছন্দ করে।”
[সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ২৫৮৯ | সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৪৮৭৪]
অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمُشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ، فَقُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ، وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ»
হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন: “মিরাজের রাতে আমি এমন কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম, যাদের নখ ছিল তামার। তারা তা দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বক্ষদেশ আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম— হে জিবরাঈল! এরা কারা? জিবরাঈল (আঃ) বললেন— এরা সেই সব লোক, যারা মানুষের গোশত ভক্ষণ করত (অর্থাৎ গীবত বা পরনিন্দা করত) এবং মানুষের সম্মান ও ইজ্জত নষ্ট করত।”
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৪৮৭৮ | মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর: ১৩৩৪০]
🟢 গীবতের সামাজিক ক্ষতি
গীবত সমাজে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে:
মানুষের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি হয়
পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হয়
বন্ধুত্ব ভেঙে যায়
সমাজে অবিশ্বাস তৈরি হয়
মানসিক শান্তি নষ্ট হয়
বর্তমান সমাজে অনেক বিভেদের মূল কারণই হলো গীবত ও গুজব।
🟢 মনীষীদের উক্তি
ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন:
“যে ব্যক্তি নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখতে পারে না, তার ঈমানের পূর্ণতা অর্জন করা কঠিন।”
এই উক্তি আমাদের শেখায় যে, চরিত্র গঠনে জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন:
যে ব্যক্তি তার ভাইকে গোপনে উপদেশ দিল, সে তাকে সত্যিই উপদেশ দিল এবং সম্মানিত করল। আর যে প্রকাশ্যে উপদেশ দিল, সে তাকে লজ্জিত ও অপমানিত করল।
🟢 গীবত থেকে বাঁচার উপায়
কথা বলার আগে চিন্তা করা
মানুষের দোষ না খোঁজা
নিজের ভুল সংশোধন করা
ভালো কথা বলা অথবা চুপ থাকা
গীবতের মজলিস থেকে দূরে থাকা
🟢 উপসংহার
গীবত একটি ভয়ংকর সামাজিক রোগ, যা ধীরে ধীরে সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। ইসলামের শিক্ষা হলো—মানুষের সম্মান রক্ষা করা, দোষ গোপন রাখা এবং সুন্দর চরিত্র গঠন করা। একজন প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যে নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অন্যের সম্মান রক্ষা করে।
🤲 দোয়া
হে আল্লাহ! আমাদেরকে গীবত, অপবাদ ও সকল প্রকার জিহ্বার গুনাহ থেকে রক্ষা করুন। আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন, আমাদের চরিত্রকে সুন্দর করুন এবং আমাদের সমাজকে ভালোবাসা ও শান্তিতে ভরিয়ে দিন। আমিন।
যোগাযোগ: হোয়াটসঅ্যাপ
+2 01211133548
+88 01885004075
ইমেইল: